ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীকে তিন-চারদিন স্থানীয় সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। সাথে স্বজন ও রোগীর তিনবেলার খাবার, পথ্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ ক্রয়ে জনপ্রতি প্রতিদিন পরিবারকে হাজার টাকারও বেশি খরচ বহন করতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় চার-পাঁচ ঘণ্টা। সরকারি হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর জন্য চারদিনে ৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আর বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি অনেক রোগী ও তাদের পরিবারের ব্যয় সামাল দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। মধ্য জুলাই থেকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। কোনো কোনো দিন সংখ্যা একশো’ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালের মেঝে, সিড়ির সামনের বারান্দা, লিফটের সামনের ফাঁকা জায়গায়ও ঠাই মিলছে না। শয্যা সংকট থাকায় ভর্তি নিতে পারছে না অনেক বেসরকারি হাসপাতালও। ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের।
রূপসা উপজেলা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দিঘলিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল বুধবার জেলার হাসপাতালগুলোতে ১৪৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তার মধ্যে খুমেক হাসপাতালে ৪০ জন। জেনারেল হাসপাতালের নিচ তলা ও দোতলায় শয্যা খালি নেই। হাসপাতালের বারান্দায় দু’দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন সৌয়াইব নামের এক কলেজ পড়ুয়া ছাত্র। তিনি সরকারি সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মিয়াপাড়ায় বসবাস করেন।
মা হোসনে আরা বেগম জানান, রবি ও সোমবারে চিকিৎসা, খাওয়া ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ ২ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কে একই ভাষ্য দক্ষিণ টুটপাড়ার বাসিন্দা মোটরমেকানিক মাসুম সরদার ও গগনবাবু রোডের আল-আমিনের। আল-আমিনের স্ত্রী সুস্মিতা শেখ বিথীর ভাষ্য বাসা ও হাসপাতাল মিলে তিন দিনে ৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নাপা ও সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং আইভি ফ্লুইড স্যালাইনস্যালাইন সরবরাহ করছে।
ব্যবসায়ীদের সূত্র বলেছে, খুলনা নগরীর বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বাসা বাড়িতে আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম পথ্য ডাব। ফকিরহাট, রূপসা, তেরখাদা ও ফুলতলা থেকে আনতে হচ্ছে। পরিবহণ খরচও বেড়েছে। প্রকারভেদে ডাব ১২০-২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মাল্টা, কমলা, আঙুর ও অন্যান্য ফল প্রতিদিন বেনাপোল ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে কদমতলা বাজারে আসছে। মাল্টা ভারত ছাড়াও কুয়েত ও অন্যান্য দেশ থেকে আসছে।
ওষুধ ব্যবসায়ীদের সূত্র তথ্য দিয়েছে, ইবনে সিনা গ্রুপের পাপাইয়া সিরাপ ও নরমাল স্যালাইন জোগান বেড়েছে। প্রতিদিন ঢাকা ও গাজীপুর থেকে পদ্মাসেতু অতিক্রম করে একমি, বেক্সিমকো, স্কয়ার ও ইবনেসিনার তৈরি ডেঙ্গুর ওষুধ নগরীর হেরাজ মার্কেটে আসছে। নাপা সিরাপ ৩১ টাকার স্থলে ৩৫ টাকা, নাপা ট্যাবলেট প্রতিপিস দেড় টাকা, পাপাইয়া সিরাপ সাড়ে তিনশ’ টাকার স্থলে ৪০০ টাকা, পাপাইয়া ক্যাপসুল ২৫০ টাকার স্থলে ৩০০ টাকা, প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ২ টাকার স্থলে আড়াই টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে প্রতিপিস ওরস্যালাইনে ৬ টাকা মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে। নগরীর সর্ববৃহৎ ওষুধের মোকাম হেরাজ মার্কেটে নাপা এক হাজার পিস, ওরস্যালাইন দেড় হাজার পিস বিক্রি হচ্ছে। কোনো ধরনের স্যালাইনের সংকট নেই। হেরাজ মার্কেট থেকে ডুমুরিয়া, বাটিয়াঘাটা, নড়াইল, চুকনগর ও মোংলায় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। ডেঙ্গুর কারণে নাপা ও ওরস্যালাইনের চাহিদা বেড়েছে।
হেরাজ মার্কেটের দোতলায় আশা ড্রাগ হাউসের স্বত্বাধিকারী মোঃ আসাদুজ্জামান, সাব্বির মেডিসিন কর্নারের বিক্রয় প্রতিনিধি ও শান্তিধাম মোড়ের এএস ফার্মার প্রতিনিধি মোঃ সাব্বির আহমেদ সোমবারের নগরীর ওষুধের বাজারের এ চিত্র বর্ণনা করেন। ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল খুলনার সূত্র তথ্য দিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। এখানে আক্রান্ত রোগীদের ওএসএল ও পপুলার কোম্পানির তৈরি নরমাল স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি স্যালাইন বিক্রি হচ্ছে। সপ্তাহধিকাল চিকিৎসা নেওয়ার পর এক একজন রোগী হাসপাতাল ছাড়ছে। হাসপাতাল ছাড়ার পূর্বেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

